নারীদের হিজাব এবং নেকাবের বিধান
প্রশ্ন: সৌদি আরব থেকে আফিফা নামক এক বোন প্রশ্ন করেছেন: তিনি শুনছেন যে, হিজাব (পর্দা) ফরজ। কিন্তু কেউ কেউ বলছেন, নেকাব (মুখমণ্ডল ঢাকা) সুন্নত। এটি কি সঠিক?
উত্তর:
আমার বোন আফিফা, মহান আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। এটি আপনার এবং আমার সকল ভাই-বোনদের কাছে স্পষ্ট যে, হিজাব একটি ফরজ বিধান যা মহান আল্লাহ তাঁর কুরআনে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সুন্নাহতে আবশ্যক করেছেন।
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ
"তোমরা যখন তাঁদের (নবীদের স্ত্রীদের) কাছে কিছু চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।" [সূরা আহযাব: ৫৩]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন:
وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ
"তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত রাখে।" [সূরা নূর: ৩১]
উম্মাহাতুল মুমিনিন এবং সাহাবিগণের নারীগণ পর্দা পালন করতেন। ইসলামের শুরুর দিকে হিজাব ফরজ ছিল না। তখন মহিলারা চেহারা খোলা রাখতেন। পরবর্তীতে হিজাবের বিধান নাজিল হয়। পর্দা নাজিল হওয়ার পর মহিলারা যখন বের হতেন তখন তাঁদের মস্তকের চাদরের কারণে তাঁদের কালো কাকের মতো দেখাত।
যেমন: হাদিসে এসেছে,
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ: لَمَّا نَزَلَتْ: يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ خَرَجَ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ كَأَنَّ عَلَى رُؤُوسِهِنَّ الْغِرْبَانَ مِنَ الْأَكْسِيَةِ
"উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন (সূরা আহযাবের ৫৯ নম্বর আয়াত) 'তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়' নাজিল হল, তখন আনসারি মহিলারা এমনভাবে বের হলেন যেন তাঁদের মাথায় কালো কাক বসে আছে (কালো রঙের চাদরে নিজেদের আবৃত করার কারণে)।" [সহিহ আবু দাউদ: ৪১০১]
নিজেদের চাদরে আবৃত থাকার কারণে তাঁদের চেনা যেত না। এমনকি কোনও কোনও মহিলা তাঁর চাদর ছিঁড়ে নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে আবৃত করতেন।
হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: يَرْحَمُ اللَّهُ نِسَاءَ الْمُهَاجِرَاتِ الْأُوَلَ؛ لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ: {وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ}، شَقَّقْنَ مُرُوطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا.
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ প্রথম হিজরতকারী নারীদের ওপর রহম করুন; যখন আল্লাহ নাজিল করলেন—'তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ আবৃত রাখে', তখন তাঁরা তাঁদের নিচের কাপড় (চাদর) ছিঁড়ে তা দিয়ে মাথা ও মুখমণ্ডল আবৃত করে নিলেন।" [সহিহ বুখারী: ৪৭৫৮]
পর্দা বা হিজাব একটি সাধারণ অর্থে ফরজ—এ ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নেই। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ফরজ বিধান, শরিয়ত ও দ্বীনের অংশ।
▪ মুখমণ্ডল ঢাকা বা নেকাব পরিধান:
ওলামায়ে কেরামের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। তা হল মুখমণ্ডল ও দুই হাতের কবজি ঢেকে রাখা। এটি এমন এক মতভেদ যেখানে ইজমা বা ঐক্যমত্য দাবি করা সম্ভব নয়। নেকাব পরিধান করা বা মুখমণ্ডল ঢাকা কি ফরজ নাকি সুন্নাহ—যেমনটি আপনি উল্লেখ করেছেন? এটি একটি বিদ্যমান মতভেদ। শরিয়তের দলিলগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি পক্ষেরই নিজস্ব দলিল রয়েছে।
➤ যারা মুখমণ্ডল খোলা রাখা জায়েজ মনে করেন, তারা দলিল হিসেবে খাসআমিয়া গোত্রের সেই মহিলার হাদিসটি উল্লেখ করেন, যিনি বিদায় হজের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে মাসআলা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। এবং কিছু হাদিস উল্লেখ করেন যা এই অর্থের দিকে ইঙ্গিত করে। এমনকি কোনও কোনও আলেম এই বিষয়ে বিশেষ কিতাবও রচনা করেছেন।
➤ আর যারা বলেন মুখমণ্ডল ঢাকা ফরজ তাঁদেরও নকল (দলিল) এবং ভাষার দিক থেকে নিজস্ব যুক্তি রয়েছে। যেমন:
ক. দলিলের (নকল) দিক থেকে: তাঁরা উম্মাহাতুল মুমিনিনের সেই হাদিসটি উল্লেখ করেন যখন তাঁরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছিলেন। আয়েশা (রা.) বলেন:
كَانَ الرُّكْبَانُ يَمُرُّونَ بِنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْرِمَاتٌ، فَإِذَا حَاذَوْا بِنَا سَدَلَتْ إِحْدَانَا جِلْبَابَهَا مِنْ رَأْسِهَا عَلَى وَجْهِهَا، فَإِذَا جَاوَزُونَا كَشَفْنَاهُ
"আমরা যখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম তখন আরোহীরা আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত। তারা যখন আমাদের সমান্তরালে আসত, তখন আমাদের প্রত্যেকে মাথার ওপর থেকে চাদর টেনে চেহারার ওপর ঝুলিয়ে দিতাম। তারা আমাদের অতিক্রম করে চলে গেলে আমরা আবার চেহারা খুলে দিতাম।" [শুনানে আবু দাউদ: ১৮৩৩]
(উক্ত হাদিসটিকে শাইখ আলবানি অন্যান্য সাক্ষ্য হাদিস (الشواهد)-এর আলোকে 'হাসান' বলেছেন। [দেখুন: জিলবাবুল মারআতিল মুসলিমাহ, পৃষ্ঠা নম্বর: ১০৭]
তবে এটিকে অনেক মুহাদ্দিস জইফ বললেও অন্যান্য বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, মা আয়েশা রা. পরপুরুষের নিকট মুখমণ্ডল ঢাকতেন। যেমন: ইফক (অপবাদ) সংক্রান্ত হাদিসে এসেছে,
فَرَأَى سَوَادَ إِنْسَانٍ نَائِمٍ فَأَتَانِي فَعَرَفَنِي حِينَ رَآنِي وَقَدْ كَانَ يَرَانِي قَبْلَ أَنْ يُضْرَبَ الْحِجَابُ عَلَىَّ فَاسْتَيْقَظْتُ بِاسْتِرْجَاعِهِ حِينَ عَرَفَنِي فَخَمَّرْتُ وَجْهِي بِجِلْبَابِي
“দূর থেকে তিনি (সাফওয়ান ইবনে মুয়াত্তাল আস সুলামী আয যাকওয়ানী রা.) একটি মানব দেহ দেখতে পেয়ে আমার নিকট এলেন এবং আমাকে দেখে সে চিনে ফেলল। কেননা পর্দার হুকুম নাজিল হওযার পূর্বে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। আমাকে চিনে তিনি “ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিঊন” পড়লে তাঁর ইন্না লিল্লাহ-এর আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তৎক্ষণাৎ আমি আমার চাদর দিয়ে মুখমণ্ডল আবৃত করে নিলাম।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫১/ তওবা, পরিচ্ছেদ: ১০. অপবাদ রটনার ঘটনা এবং অপবাদ রটনাকারীর তওবা কবুল হওয়া] অনুবাদক)
খ. তেমনিভাবে তাঁরা বিয়ের প্রস্তাব সংক্রান্ত মাসআলা দিয়ে দলিল দেন। তাঁরা বলেন যে, কোনও ব্যক্তি যে মহিলাকে বিয়ে করতে চায়, তার চেহারা দেখার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, মূলত মহিলারা চেহারা ঢেকে রাখতেন বলেই বিশেষ প্রয়োজনে বা কল্যাণের উদ্দেশ্যে তাকে দেখার এবং মহিলার জন্য চেহারা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তাই হে প্রিয় বোন, এ বিষয়ে এমন আরও অনেক দলিল রয়েছে।
গ. ভাষাগত দিক থেকে তাঁরা আল্লাহর এই বাণী দিয়ে দলিল পেশ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءَ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ
"হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলো, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়।" [সূরা আহযাব: ৫৯]
তাঁরা বলেন যে, আরবি ভাষায় 'জিলবাব' হল এমন পোশাক যা মাথার উপর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢেকে রাখে এবং কোনও কিছুই প্রকাশ রাখে না।
➽ লক্ষ্য করুন—
উভয় পক্ষের দলিলই অত্যন্ত স্পষ্ট। এ কারণেই অনেক আলেম যারা চেহারাকে সতর (আবশ্যক আবরণীয়) মনে করেন না তাঁরাও তাঁদের ঘরের নারীদের চেহারা ঢেকে রাখার নির্দেশ দেন অধিক উত্তম বা সতর্কতার জায়গা থেকে। এটি এমন এক বিষয় যেখানে একজন আলেমের ইজতিহাদ (গবেষণা) তাঁকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ সুন্দরী এবং সাধারণ চেহারার নারীর মধ্যে পার্থক্য করেন। তাঁরা বলেন যে নারী সুন্দরী, নেকাব ফরজ হওয়ার বিষয়ে তার বিশ্বাস না থাকলেও ফিতনা এড়াতে তার জন্য নেকাব পরা আবশ্যক ও জরুরি হয়ে পড়ে।
তাই হে প্রিয় বোন, এই মাসআলাটি প্রাচীনকাল থেকেই আলোচিত হয়ে আসছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
اسْتَفْتِ قَلْبَكَ وَإِنْ أَفْتَاكَ النَّاسُ وَأَفْتَوْكَ
"তোমার বিবেকের কাছে ফতওয়া চাও, যদিও মানুষ তোমাকে ফতওয়া দেয় (অর্থাৎ বারবার ফতওয়া দিলেও নিজের অন্তরের প্রশান্তি খুঁজবে)।" [মুসনাদে আহমদ: ১৮০২৫]
এখানে অর্থ হল—মানুষ কোনও কিছু বর্জন করার ক্ষেত্রে নিজের বিবেকের সিদ্ধান্ত নেবে, কোনও হারাম কাজ করার ক্ষেত্রে নয়। অর্থাৎ কোনও মহিলা যদি দুটি মতের মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন তবে তার জন্য সতর্কতা হল, চেহারা খোলা রাখা বর্জন করা এবং নেকাব মেনে চলা।
➽ আরেকটি বিষয় হল: যদি কোনও দেশের প্রচলিত নির্ভরযোগ্য ফতওয়া মুখমণ্ডল ঢাকার পক্ষে হয় তবে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে সে দেশের নারীদের তা মেনে চলা উচিত। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।
ফতওয়া প্রদানে:
বিশিষ্ট ফকিহ ও গবেষক ড. আব্দুল আজিজ বিন ফারহান আল আনজি (সৌদি আরব)
অনুবাদ ও গ্রন্থনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন