বিদায় হজের খুতবা : কিছু আলোকপাত
হজের যাবতীয় বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে তাওহীদ প্রতিষ্ঠার
নিমিত্তে। হজের বিধানাবলির মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার পবিত্রতা
ঘোষণা করা, তাঁর স্তুতি জ্ঞাপন করা, তাঁর
কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা, তাঁর আদেশ পালন করা, একত্ববাদের
ঘোষণা দেয়া এবং তাঁর যে কোনো অংশীদারিত্বকে অস্বীকার করা। হজের শ্লোগানতুল্য
তালবিয়ায় যেমন বলা হয়,
« لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ
لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ لاَ شَرِيكَ لَك ».
‘আমি হাযির, হে আল্লাহ, আমি হাযির। তোমার কোন শরীক নেই, আমি হাযির।
নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা ও নিয়ামত তোমার এবং রাজত্বও, তোমার কোন
শরীক নেই।’ [বুখারী : ৫৯১৫, মুসলিম : ১১৮৪]
এভাবেই এ বাক্যে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে তাওহীদের ঘোষণা। জমাট বাধা শিরকের অন্ধকার
দূর করার জন্য এ বিশাল আহ্বান হাজীদের সঙ্গে ধ্বনিত থেকে থাকে। যাতে মানুষের স্বভাব
এবং প্রকৃতি হয় সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন। পূর্বে যেমন তা ছিল পৌত্তলিকতা থেকে পবিত্র। তাওহীদের দীপ্তিতে তা দীপ্তিময় হয়। অহীর আলোয় তা হয় আলোকিত এবং পরাক্রমশালী
এক সত্তার দাসত্বে তা হয় অটল। তেমনিভাবে তা সব ধরনের তাগুত এবং মূর্তিকে ছুড়ে ফেলে
দেয়। ঈমানী কল্পনাকে সুদৃঢ় করে।
অতএব এক আল্লাহ
তা‘আলা ছাড়া এমন কোনো মা‘বুদ নেই ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে সৃষ্টিজীব
যার অভিমুখী থেকে পারে। এক আল্লাহ তা‘আলার দিক ছাড়া এমন কোনো
দিক নেই যেখান থেকে তারা তাদের আচরণ, আখলাক, তাদের
শরীয়তের নীতিমালা কিংবা বিধানাবলী পেতে পারে। এক আল্লাহ তা‘আলার
পন্থা ছাড়া তাদের এমন কোনো পন্থা নেই যা তাদের জীবন এবং তাদের কার্যাদি পরিচালনা করতে
পারে। আল কুরআনুল কারীমে বলা
হয়েছে,
﴿ وَمَا مِنۡ إِلَٰهٍ إِلَّآ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۚ ﴾ [المائدة: ٧٣]
‘এক ইলাহ ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই।’{সূরা
আল-মায়িদা, আয়াত : ৭৩}
বিদায়ী হজের বছর জিলহজ মাসের ৮ তারিখ। মক্কা মুকাররমার কোল
থেকে মিনার পাথুরে অঞ্চলের উদ্দেশ্যে এক ঝাঁক নববী মশাল যাত্রা শুরু করল। সেখানেই রাত্রিযাপন
করল। যাতে ৯ তারিখ আরাফার দিকে রওনা করা যায়। সেখানে সূর্য হেলে যাওয়ার পর নানা জনপদ
থেকে দলে দলে দুর্গম গিরি ডিঙ্গিয়ে আসা লাখো জনতার উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দেন। এমন সারগর্ভ ও ব্যাপক খুতবা দান করেন,
যা প্রতিটি হৃদয় ও কর্ণকে প্রজ্ঞা ও বিধানে, অনুগ্রহ ও
বিশ্বাসে এবং দয়া ও সদাচারে পূর্ণ করে দিয়েছে। এ থেকে প্রতিটি অন্তুর খুঁজে পেয়েছে
আত্মশুদ্ধির যাবতীয় উপায়, হেদায়েতের সকল প্রকার এবং জাতিঘাতি
সব ব্যাধি থেকে সুরক্ষার পন্থা।
বলাবাহুল্য, এ ছিল এমন এক উপলক্ষ এত
বিশাল জনগোষ্ঠীর সামনে এভাবে কথা বলার সুযোগ নিয়ে যা বারবার আসে না। বিদায়ী নেতার সঙ্গে
কোনো জাতির এমন প্রাণোচ্ছল ও বিশ্বাসদীপ্ত সাক্ষাতের তুলনা হয় না। একইসঙ্গে তা বাঁধ
ভাঙ্গা কান্না ও বিষাদেরও উপলক্ষ। কারণ, তা ছিল আখেরী উম্মতের
কাছ থেকে আখেরী নবীর শেষ সাক্ষাৎ।
«أَيّهَا النّاسُ اسْمَعُوا قَوْلِي ، فَإِنّي لَا أَدْرِي لَعَلّي
لَا أَلْقَاكُمْ بَعْدَ عَامِي هَذَا بِهَذَا الْمَوْقِفِ أَبَدًا».
‘হে লোক সকল, তোমরা আমার কথা শুন, কারণ আমি জানি না সম্ভবত এ বছরের পরে এ জায়গায় আর কখনো তোমাদের সঙ্গে
আমার সাক্ষাৎ হবে না।’ [ইবন হিশাম, আস-সিরাহ
আন-নাবাবিয়্যাহ : ২/৬০৩]
উম্মতের উদ্দেশে প্রদত্ত তাঁর এ ভাষণে স্থান পেয়েছে স্থায়ী
রিসালাতকে পৃথককারী বিশাল প্রমাণস্বরূপ সাধারণ নীতিমালা এবং ব্যবস্থাপনা জ্ঞানের ভিত্তিসমূহ।
কোনো মাইক বা প্রচার মাধ্যম ছাড়াই এ বিশাল গণজমায়েত তাঁর বক্তব্য শ্রবণ করেছে।